Advertisement

Wednesday, March 23, 2016

3:44 AM
বাংলাদেশে এসেছিলেন স্ত্রীর চাকরি সূত্রে। পাকেচক্রে হয়ে গেলেন বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের কোচ!
গঞ্জালো মোরেনো কখনো ভাবেননি তাঁর জীবন এতটা বদলে যাবে। ঢাকায় ইউনিসেফ অফিসে চাকরি নিয়ে স্ত্রী ঢাকা এলেন মাস কয়েক আগে। স্বামী ও দুই সন্তান কার্লোস আর লোলা তাঁর সঙ্গী। সন্তানরা ঢাকায় পড়বে, বাবার হাত ধরে স্কুলে যাবে। একটা পরিবারের চেনা ছকটা কিন্তু মোরেনো পরিবারের ক্ষেত্রে পাল্টে গেল। মোরেনোর হাতে এখন কোচিং বোর্ড, মাথায় আগামীকাল বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের শেষ ম্যাচে জর্ডানকে আটকানোর নানা অঙ্ক।
অথচ কখনোই তিনি ভাবেননি বাংলাদেশ জাতীয় দলের কোচ হবেন! নিজেই বলেন, ‘এমনিতে এ দেশে এসে ভাবছিলাম ফুটবল নিয়ে কিছু করা যায় কিনা। তবে সত্যি বলতে এত বড় দায়িত্ব পাব তা আমার কল্পনায় ছিল না।’ থাকার তো কথাও নয়। জাতীয় দলের কোচ নিয়ে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) দীর্ঘ মেয়াদে কোনো পরিকল্পনা ছিল না, তাই হাতের কাছে পেয়ে মোরেনোকে দিয়ে দেওয়া হলো জাতীয় দলের কোচের দায়িত্ব।
চল্লিশ পেরোনো সাবেক স্প্যানিশ ফুটবলারের জন্ম বার্সেলোনায়। ঢাকায় এসে চাইছিলেন এখানকার ফুটবল নিয়ে কিছু করতে। খেলেছেনও বার্সেলোনার হয়ে! অবশ্য বার্সার মূল দল নয়, ‘বি’ দল। মূল দলের সঙ্গে একটা ম্যাচে একাদশেও ছিলেন চ্যাম্পিয়নস লিগে। তবে কিশোর বয়সেই বার্সার একাডেমির ছাত্র হিসেবে বেড়ে ওঠাই তাঁর ফুটবল জীবনের সবচেয়ে বড় গর্ব। সেটিই মোরেনোকে বাংলাদেশে কাজে সুযোগ করে দিয়েছিল শুরুর দিকে।
বাফুফে তাঁকে প্রথমে নিয়োগ দিয়েছিল তৃণমূল কোচ হিসেবে। কিন্তু অগোছালো বাফুফের সেই ‘প্রকল্প’ এগোয়নি। এরপর তাঁকে দেওয়া হলো অনূর্ধ্ব-১৯ দল। সেই পর্ব অসমাপ্ত রেখেই অস্থির বাফুফে এসএ গেমসে অনূর্ধ্ব-২৩ দলের কোচ করে দেয় মোরেনোকে। এর আগের টুর্নামেন্ট বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপে বাংলাদেশ অলিম্পিক দল নিয়ে প্রথমবার দাঁড়ান ডাগআউটে। এসএ গেমসে সোনা হারিয়ে এবার বাংলাদেশ ফিরেছে ব্রোঞ্জ নিয়ে। ফলাফলে অবনতি হলেও কোচ পেলেন পদোন্নতি।
বলা হচ্ছে, মোরেনোকে শুধু জর্ডান ম্যাচের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোচ নিয়ে বাফুফের যেমন পরিকল্পনার আকাল চলছে, তাতে মরোনোকে আরও লম্বা সময়ের জন্য দেখা অস্বাভাবিক নয়। স্ত্রীর চাকরি সূত্রে ঢাকায় এসে একটা দেশের জাতীয় দলের পুরোদস্তুর কোচ হয়ে যাওয়া নিশ্চয়ই মোরেনোর রোমাঞ্চটা আরও বাড়াবে। এরই মধ্যে তাঁর রোমাঞ্চটা টেরও পাওয়া যাচ্ছে। জর্ডান যাওয়ার আগে প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘আমি খুব খুশি। দারুণ লাগছে আমার। জাতীয় দল নিয়ে সফরে যাচ্ছি, বুঝতেই পারছেন আমি কতটা শিহরিত।’ তবে ক্ষণে ক্ষণে সিদ্ধান্ত পাল্টানো বাফুফে জর্ডান ম্যাচের পরই হয়তো বলতে পারে, ‘আপনি এবার যেতে পারেন!’
গত কিছুদিন ধরে জাতীয় দলের কোচ নিয়ে রীতিমতো সার্কাস দেখাচ্ছে বাফুফে। আগাগোড়া বিচার বিশ্লেষণ না করে যখন-তখন কোচ নিয়োগ দিচ্ছে। অনেকটা আকাশে বিদ্যুৎ চমকানোর মতো। এই আছে এই নেই! ইতালির কোচ ফাবিও লোপেজকে যেমন হঠাৎ একদিন বসিয়ে দেওয়া হলো কোচের চেয়ারে। যাঁর সম্পর্কে নাকি কোনো খোঁজ খবরই নেওয়া হয়নি। সেই লোপেজ দায়িত্ব নিয়ে জাতীয় দলে চালান ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা। গোটা দলটাকে ওলট পালট করে ফেলেন, যার খেসারত গুনে তাঁকে চাকরিও খোয়াতে হয়েছে।
তার আগে লোডভিক ডি ক্রুইফকে হঠাৎ বাদ দেওয়া হলো। এর কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাও দিতে পারেনি ফেডারেশন। কেনই বা তাঁকে একবার বিদায় দিয়ে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল সেটিও এক ধাঁধা। ওই ধাঁধাঁর মধ্যেই সাফের অল্প কয়েক দিন আগে মারুফুল হকের হাতে অর্পিত হলো কোচের দায়িত্ব। সাফ ও বঙ্গবন্ধু গোল্ড কাপে ব্যর্থতার পর সরে যাওয়া মারুফুল হকের জুতায় পা গলালেন মোরেনো।
অথচ বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন বলেছিলেন, জাতীয় দলের কোচ নিয়োগ দেওয়া হবে বুঝে-শুনে। কোচের সঙ্গে হবে পেশাদার চুক্তি। প্রতিষ্ঠিত কোচ আনারও অঙ্গীকার তিনি করেছিলেন অনেকবার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি। মাঝখানে ডি ক্রুইফকে আনা হয়েছিল উচ্চ বেতনে। কিন্তু তাঁকে বেতনই দেওয়া যায়নি ঠিকমতো। এ নিয়ে কত কাণ্ডই না হয়েছে! তারপরও ডাচ ওই কোচের অধীনে একটু আধটু ভালো ফুটবল যখন খেলতে শুরু করল দল, তখনই চুকিয়ে ফেলা হলো সেই অধ্যায়।
অথচ ডি ক্রুইফকে ঢাকাতেই রাখা যায়নি। খেলার সাত দিন আগে আসতেন, বাকি সময় থাকতেন হল্যান্ডে নিজের বাড়িতে। ‘কাজের বিনিময়ের খাদ্যের’ মতো ‘কাজের বিনিময়ে বেতন’ পদ্ধতিতে কিছুদিন তাঁকে রাখার পর সাফের ঠিক আগ মুহূর্তে রদবদল। কোচ নিয়ে এসব অস্থির কাজ-কারবার বাফুফে এখন সওয়ার হয়েছে মরেনোর ওপর, বাংলাদেশ জাতীয় দলের কোচ হওয়াটা যাঁর নিজের কাছেই বড় এক চমক।
বাংলাদেশের ফুটবলের সাম্প্রতিক ব্যর্থতার দায় নিশ্চয়ই ফুটবলারদেরই বেশি। তাঁদের চেষ্টার ঘাটতি আছে বলে মনে করেন প্রায় সবাই। একই সঙ্গে কোচ নিয়োগ নিয়ে ফেডারেশনের পরিকল্পনাহীনতাও কম দায়ী নয়। সহসাই এই অবস্থার উন্নতি হওয়ার লক্ষণও নেই। ফেডারেশনের নির্বাচন সামনে রেখে কর্তারা যে ব্যস্ত সে দিকেই।

0 comments:

Post a Comment